Showing posts with label বই. Show all posts
Showing posts with label বই. Show all posts

Friday, October 11, 2019

বুক রিভিউ - হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য: হুমায়ুন আহমেদ

এটি হিমু বিষয়ক কোন বই না। পড়তে গিয়ে পাঠক প্রথমেই প্রতারিত হবার সম্ভবনা আছে। মূলত "হিমু" ইমেজকে আশ্রয় করে সংকলিত ও নামাঙ্কিত একটি বই। বইটি এমনভাবে প্রকাশিত যেন মেলায় বিক্রি বেশি হয়। মূলত তখন হিমু বিষয়ক একটি বই সব প্রকাশকই চাইতেন, তাদের আবদার মানতে গিয়েই এমন বইয়ের প্রকাশ। হিমু সম্পর্কে লেখকের যে বাড়াবাড়ি প্রশ্রয় ছিল এটি তার একটি উদাহরণ মাত্র, লেখক সেটি কখনো অস্বীকারও করেননি।

এই বইয়ের বাড়তি পাওনা বলতে প্রতিটি গল্পের বা লেখার আগে লেখকের কিছু কথা; কিভাবে লেখাটি লেখা হল, লেখা সম্পর্কে লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দ - অপছন্দ বা মতামত। এটুকু বিশ্বাস করে নিলে লেখকের ও তার লেখা সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়।

মোট দশটি গল্প আছে বইটাতে। এর মাঝে "পাপ" বিষয়ক গল্প তিনটি বেশ ভালো। এছাড়া "গন্ধ" গল্পটি ভালো। "জনৈক আব্দুল মাজেদ" এবং শিরোনামের "হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার" এই বইয়ের সবচে দুর্বল অংশ ("গল্প" বলা যাচ্ছেনা এগুলোকে যদিও এগুলো বিভিন্ন পত্রিকা ও প্রকাশনায় গল্প হিসেবে ছাপা হয়েছিল)

গল্পগুলোকে যদি আলাদা করে ব্যবচ্ছেদ করি তবে:

নসিমন বিবি -
ফরিদপুরের নসিপুর বিবির স্বপ্নে পাওয়া "উপহার" বিষয়ক একটি "আধোভৌক্তিক" লেখা। এটাকে হুমায়ূন আহমেদের সাইন্স ফিকশন বললেও ভুল হয়না। সুখপাঠ্য লেখা।

পাপ -
এই গল্পটি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ১৯৭১ এর অংশবিশেষ। এইও "চিন্তা উদ্রেককারী" লেখা!

পাপ-২
হাজি মান্না মিয়া -
ভালো। ছোট গল্প হিসেবে চমৎকার।

পাপ-৩
সালাম সাহেবের পাপ -
মিসির আলীর একটি গল্প পুরো গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং। বিশেষ করে শেষটা।

দৌলত শাহ'র অদ্ভুত কাহিনী -
এটিকে হুমায়ূন আহমেদের সাইন্স ফিকশন গল্পের মাঝে ফেলা যায়। গাঁথুনিতে চমৎকার একটি গল্প।

শাহ্ মকবুল -
পাগল বিষয়ক গল্প। হুমায়ূন আহমেদের ফেলে যেসব লেখা শাওন থেকে কেনা ট্রাংকের মধ্যে জামাত সেই লেখার একটি পূর্ণাঙ্গরূপ এটি। ভালো তবে কোথায় যেন একটু আটকে যায়, খটকা লাগে পড়তে গিয়ে। একবার পড়ে ধরতে পারিনাই।

পিশাচ -
এটিকে চমৎকার গল্প বলা যায়। একজন মানুষ পিশাচ সাধনা করে যায় অন্তরে ধারণ করে এক সমুদ্র প্রেম আর মায়া।

গন্ধ -
চমৎকার একটি গল্প। গল্পের মাঝে একটা চমৎকার মোড় আছে যেটি দারুণ।

জনৈক আব্দুল মজিদ -
এটাও একটি ফরমায়েশি লেখা। বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে একটি ডকুমেন্টারি কাজ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটা নিয়ে লেখা। এইডস সম্পর্কে সামাজিক বিজ্ঞান বইতে যদি একটা লেখা থাকত সেখানে যেরকম লেখা থাকবে এটি ঠিক সেরকম একটি লেখা। এই লেখা নাকি পাঠ্য বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল! সম্ভবত সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যবই- এ; বাংলা পাঠ্য বই- এ সাহিত্য হিসেবে না।

হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার -
একেবারেই ফরমায়েশি লেখা। লেখা নেবার জন্যে কেউ অপেক্ষা করছে। তাকে বসিয়ে রেখে একটা লেখা উৎপাদন করে দেবার প্রয়াসেই এই লেখা। যদিও এমন অবস্থাতেও হুমায়ূন আহমেদ অনেক ভালো লেখা লিখেছেন কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। হিমুর সাথে জড়িত সব চরিত্রের সাথে একটি কাল্পনিক কথোপকথন।

১১/১০/২০১৯

Sunday, August 18, 2019

বই পর্যালোচনা: জল জোছনা - হুমায়ূন আহমেদ

বইটি অনেক আগের। ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত। আগে পড়েছিলাম তবুও আবার পড়ে ভালো লাগলো। তবে "আগে পড়েছিলাম" এটুকু বুঝতে আমাকে শেষদিকে বুড্ডার সাগরেদ ছোটনের এর বদ অভ্যাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে!(কিশোর মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় জিনিসের মাঝে শুধু ঐটুকুই মাথায় রেখে দিয়েছে)।

হুমায়ূন আহমেদের বইগুলো খুব দ্রুত পড়ে ফেলা যায়, এটিও তার ব্যতিক্রম নয়।

মূল কাহিনী বেশ ছোট। একটি পরিবার দূরে বেড়াতে যাওয়ার সময় আরিচা ফেরি ঘাটের কিছু আগে রাস্তায় অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়া দুটি শিশুর মৃতদেহ নিয়ে বাইরে থেকে আসা একটি গ্রুপ ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। যেমনটা আসলে হরহামেশাই হচ্ছে এদেশে। তবে ঘটনার সময়কাল এখন থেকে বেশ আগের। তখনকার বাস্তবতা বইটি পড়লে বেশ বোঝা যায়।

এটি একটি রুঢ় বাস্তব গল্প কিন্তু এই  গল্প বুনন করতে গিয়ে ছোট ছোট চরিত্র এসেছে, দুঃখগাথা, প্রেম, সাহস, মায়া এগুলো এসেছে।

চমকপ্রদ বিষয় হচ্ছে এখানে একটি চরিত্র মীরা বা জোছনা; যে কিনা সশরীরে উপস্থিত না থেকেও পুরো গল্পটির বড় স্থান দখল করে আছে! যাদের কাছে আসলে মানুষ বদলে যায় মীরা ছিল তেমন একজন। মীরা জহিরের স্ত্রী, যে বিয়ের কিছুদিন পরেই কোন কারণে মারা যায়। শুধু পেছনে ফেলে যায় জহির, জহির এর বন্ধু মনজুর, মনজুরের  স্ত্রী রেবেকা এবং তাদের কিছু সম্পর্কের টানাপোড়েন। যদিও শেষ দৃশ্যে এসে সব মিটে যায়। বড় বিপর্যয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেদের গড়ে তোলা ছোট ছোট সমস্যা কাটিয়ে ওঠে।

নিতু এখানে মনজুর দম্পতির একমাত্র আঠারো বছর বয়সী কন্যা। যদিও সে গল্পের নিয়ামক মাত্র এবং এখানে "অপূর্ব রূপবতী"ও নয়! তবে গল্পের প্রথমে কেন রেবেকা মেয়েকে খারাপ দেখাচ্ছে জেনেও সবুজ শাড়ী পড়তে না দিয়ে কমলা শাড়ি পরতে বাধ্য করে সেটি পরিষ্কার হলো না!

তবে যে চমৎকার একটি দৃশ্যের কথা বলা আছে বইটিতে সেটি দেখতে আমারও ইচ্ছে করছে। কোন এক শীতের পরিষ্কার জোছনা রাতে হাজার হাজার পাখি যদি আকাশে এমন করে উড়ে যায় যে সেই পাখির গায়ে পড়ার কারণে জোছনা মাটি ছুঁতে পারছে না! জোছনার ছায়ায়  চারদিক অন্ধকার! জোছনা মেখে মেখে পাখিগুলো উড়ে চলছে... কী অদ্ভুত, অলৌকিক সুন্দর দৃশ্য!

১৮/০৮/২০১৯

Thursday, August 15, 2019

বই পর্যালোচনা: লিপি - হুমায়ূন আহমেদ

প্রথমে নাম দেখে মনে হয়েছে:
"হুমায়ূন আহমেদ তো তার গল্পের নায়িকাদের নাম এমন রাখেন না"!
পরে বুঝতে পারলাম প্রচ্ছদ দেখে। এখানে অন্য লিপির কথা বলা হচ্ছে।

ছোট একটি গল্প। হুমায়ূন আহমেদ যখন নর্থ ডাকোটায় থাকতেন তখনকার একটি কথা। ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকের ঘটনা; যখন তিনি পিএইচডি করছেন এবং থিসিসের কাজে তুমুল ব্যস্ত। এরিখ থমসন নামের একজনের চিঠির সূত্রে তার উদ্ধার করতে চাওয়া এক লিপি বা চিঠি যেটি কিনা তার "অপূর্ব রূপবতী" ও অসাধারণ মেধাবী স্ত্রী কারোলিনা তার জন্য লিখে গেছেন। গেছেন মানে মারা গেছেন।এরপরের গল্প চমৎকার...

১৫/০৮/২০১৯

Friday, August 9, 2019

বই পর্যালোচনা: মাতাল হওয়া - হুমায়ূন আহমেদ

মাতাল হওয়া বইটা আগে পড়া হয়নাই। এতদিন পর পড়লাম এমন একটা সুন্দর বই! মন খারাপ লাগছে!

বইটাতে হুমায়ূন আহমেদ তার নিজের ছাত্রজীবনের গল্প বলার পাশাপাশি মিলিয়ে আরো একটি গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। সেই গল্পের নায়িকা নাদিয়া, দিয়া বা তোজল্লি!
এই নাদিয়া তার কাছে চিঠি লেখা সত্যিকারের শ্যামলা, ছিপছিপে, ঢাকা ভার্সিটি পড়ুয়া নাদিয়া হতে পারে আবার নাও হতে পারে! গল্পকার মাত্রই গল্প লেখেন, সত্য বয়ান  পাঠক পড়ে না!

এই বইতে হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য বইয়ের মত নায়িকাকে একবারও "অপূর্ব রূপবতী" বলা হয়নি বরং নায়ককে "গ্রীক দেবতাদের মত", "এমন সুন্দর পুরুষ দেখিনাই", "অপূর্ব রূপবান" ইত্যাদি বিশেষণ দেয়া হয়েছে একাধিকবার। গল্প যার নাম "রাজা চৌধুরী"।

গল্পের প্রধান চরিত্র হিসেবে বলা যায় দুদে উকিল, মোনায়েম খাঁর ছোট ভাই ময়মনসিংহবাসী হাবিব সাহেব, যার ডাক নাম "হাবু"। তবে এই ডাকনাম পড়ে তাকে মোটেই জেনতেন ভাববার কোন কারণ নাই। যেকোন কেইসকে নিজের পক্ষে নেবার ক্ষমতা তার আছে, তিনি চাইলে খুনের আসামীকেও ছাড়িয়ে আনতে পারেন, একজনের খুনের দায়ে অন্যকে সাজার ব্যাবস্থা করতে পারেন, পুলিশ আদালত তার হাতের তালুতে। শুধু তার মায়ের কাছে তিনি হাবু!

হাবিব সাহেবের মা, হাজেরা। যিনি সারাক্ষনই তার ঘরে থাকেন এবং সবাইকে তার ইচ্ছামত হুকুম করেন। তার নিজের একটা আলাদা জগৎ আছে, নিজের চিন্তার জগতে তিনি স্বতন্ত্র। অসম্ভব বুদ্ধিমান একজন নারী। তবে তার ছেলে হাবিবের সাথে তার একটা চারত্রিক দ্বিমুখীতা আছে যদিও হাবিব নিজে যতই ধূর্ত হোক, যতই নিয়মের বাইরে যাক মায়ের প্রতি তার আচরণ কখনোও বিরূপ নয়। যদিও হাজেরা বিবি তার এই আচরণের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন গল্পের এক পর্যায়ে।

গল্পের নায়ক বিশাল জলমহালের অধিকর্তা পুত্র রাজা চৌধুরি, হাসান রাজা চৌধুরি। যে এখানে খুনের দায়ে পালিয়ে বেড়ানো আসামী আর হাবিবের সাহেবের মক্কেল! যদিও খুব বিকশিত নয় কিন্তু হাসান রাজা চৌধুরি এখানে চরিত্রবান পুরুষের ছবি।

গল্পের শুরুতে ফারুক চরিত্রের একটি সম্ভবনা দেখা দিচ্ছিল। যথেষ্ট সম্ভাবনাময় চরিত্র হলেও সে মূলধারায় আসেনি।

আরো কিছু চরিত্র আছে হাবিবের সহযোগী প্রণব বাবু, পাংখাপুলার রশিদ, নাদিয়ার শিক্ষক বিদ্যুৎ কান্তি দে (যদিও এই চরিত্রের একটি পরিণতি আছে কিন্তু বিকশিত হবার আরো সুযোগ ছিল! মানে, মনে মনে খুব চাইছিলাম)

গল্পের সাথে সাথে হুমায়ুন তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনকে নিয়ে বলেছেন, সে সময়ের রাজনৈতিক পট নিয়ে কিছু কথা বলেছেন, মওলানা ভাষাণী আর শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থানের কথা আছে। যদিও এগুলোর চাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাটাই বেশী আলোকিত হয়েছে। খোকা, পাচপাত্তুর এর সাথে তার হাত দেখা, ম্যাজিক দেখানো, প্লানচেট, সম্মোহনবিদ্যা, আনিস সাবেতের সাথে প্রথম মিছিলে যাওয়া এগুলোই বেশী উঠে এসেছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ  হচ্ছে হিমুর "রুপা" চরিত্র সৃষ্টির কথা। বন্ধুর হয়ে তার প্রেয়সীর জন্য প্রেমপত্র লিখে দেয়া, যেগুলোকে নিজে নিজেই তার প্রথম সাহিত্যকর্ম বলে স্বীকার করেছেন। লিখতে লিখতে রুপার ছবিও দেখা হয়ে যায়। হয়ত রুপার জন্য লিখতে লিখতে মিষ্টি রুপার জন্য হুমায়ুনের মনে একটা জায়গা তৈরী হয়েছিল। তাই রুপাকে হারিয়ে দিতে যেতে চাননি, অমর করে রেখেছেন তার গল্পের হিমুর সাথে।

গল্পের শেষের দিকে হাসান রাজা চৌধুরির মত একজন আদর্শ চরিত্রের যুবক কেন খুন করতে গেল তার রহস্য যেমন উন্মোচিত হয়েছে তেমনি একেবারে শেষে চূড়ান্ত বিয়োগান্তক সমাপ্তির মাধ্যমে নাদিয়া ও রাজা চৌধুরি চরিত্রদুটিও পরিণত হয়েছে।

পাঠককে ভাবাবার মত একটা সমাপ্তি আছে। একটা হাহাকার আছে, আবার অনেক উত্তর না জানা প্রশ্নও আছে।

সবমিলে চমৎকার একটা বই।

২৭/০৭/২০১৯

Wednesday, October 17, 2018

বুক রিভিউঃ যদ্যপি আমার গুরু - আহমেদ ছফা

বইয়ের শুরুতে যেভাবে দুলাইন লেখা:
"যদ্যপি আমার গুরু শুড়ি বাড়ি যায়,
তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়!"
তাতে মনে হয়েছিলো বুঝি বেশ রসের দেখা পাওয়া যাবে বইটিতে। কিন্তু অবস্থা মোটেই তা না, বেশ সিরিয়াস টাইপ লেখা যার বিষয়বস্তু প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক; লেখকের শিক্ষক, যাকে তিনি "গুরু" মেনেছেন।

যদিও সত্য কথন হচ্ছে আমি ওনার নামই এর আগে শুনিনাই!(অবশ্য আহমদ ছফাও তার সময়ে তার নিজের প্রয়োজনের আগে প্রফেসর রাজ্জাককে চিনতেন না!) তবে পুরো বই পড়ে কিন্তু আমার প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের প্রতি একটা আলাদা শ্রদ্ধা তৈরি  হয়েছে।

খুব ঋজু চরিত্রের অধিকারী, স্পষ্টভাষী, বিলাসহীন ও প্রচারবিমুখ, আজীবন অকৃতদার এবং সবাইকে উপেক্ষা করে নিজের মতে অবিচল থাকার মত দৃঢ় এই মানুষটির নেশা বলতে হুক্কা, আর সত্যিকারের নেশা হচ্ছে বই পড়া! ক্লাস নিতে তাকে খুব বেশি আগ্রহী মনে হয়নি কিন্তু পড়াশোনায় তার আগ্রহ অসীম। তার পান্ডিত্য সবাইকে চুম্বকের মত আকর্ষন করত। অনেকেই ঈর্ষা-কাতর হতেন তার জ্ঞানের জন্য। শুধু তার সময়ের না, যে কোন সময়ের জন্যেই হয়ত তিনি অনন্য বিদ্বান একজন মানুষ। এমনকি শেষদিকে চোখের দৃষ্টিশক্তি কমে জ্বরাগ্রস্ত হলেও তাকে দেখা গেছে ঝুঁকে বইয়ের পাতায় ডুবে যেতে।

লেখকের সাথে তার দেখা বা পরিচয় হয় মাষ্টার্সের আগেই পিএইচডি স্কলারশীপের থিসিসের সুপারভাইজার খোজার সুবাদে। বাংলা সাহিত্যের ওপর করা এই থিসিস যদিও শেষতক আলোর মুখ দেখেনি (কাকতালীয়ভাবে তার সুপারভাইজার প্রফেসর রাজ্জাকের থিসিসটিও কখনও আলোর মুখ দেখেনি!)। স্বাধীনতার আগে শুরু করা পিএইচডি ডিগ্রিটাও তার নেয়া হয়নি কিন্তু পরিচয়টা রয়ে গেছে, বাহাত্তর থেকে চুরাশি; তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ডালপালা মেলেছে; অবলীলায় ঢাকাইয়া বুলি আওড়ানো প্রফেসর রাজ্জার ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছেন আহমেদ ছফা'র গুরুতে। (আহমদ ছফার মত বিদগ্ধজনের গুরুর আসন নেয়া কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়! যেখানে আধুনিক যুগের অনেক প্রতিথযশা লোকের কাছেই ছফা একজন আদর্শ!)

বইয়ের প্রথম যে কথায় আমার টনক "বড়সড় আকারে" নড়ে সেইটা হচ্ছে, প্রফেসর রাজ্জাকের মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও জ্ঞান তৈরিতে উল্ল্যেখ্য তেমন অবদান নেই! প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাকিস্তান আন্দোলনের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত তৈরী, ভাষা আন্দোলনের নেতৃত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এই তিনটি বড় অবদান ছাড়া আর বলবার মত কিছু নেই! যদিও এই তিনটিই পুরো জাতিকে পথ দেখিয়েছে তবুও জ্ঞানচর্চা ও বিকাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তেমন ভূমিকা রাখেনি। জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ কোন গবেষণা করার চেষ্টা করেন নি; শুধু মিলাদ আর বিয়ে পড়ানোয় সময় পার করেছেন; ইংলন্ডের ডিক উইলসন, ফ্রান্সের ক্লদ লেভি লস-সহ দেশী অংকের রমজান আলী(যার বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ হবার সকল সম্ভবনা ছিল); অনেক বিখ্যাত জ্ঞানীগুনীজন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যপনা করেছেন কিন্তু তারাও একে শিক্ষায় "আদর্শ" কর‍তে পারেন নি। "প্রাচ্যের অক্সফোর্ড" সর্ববেই একটি "অতিশয় রঞ্জিত" কথা! (ভাববার বিষয়!!)

কোন  একটা জায়গাকে চেনার উপায় হচ্ছে সেখানকার বাজার আর বইয়ের দোকানে যাওয়া! সেখানকার মানুষ কি খায় আর কি পড়ে তা দিয়েই তাদের যাচাই করা যায়। পুরোন ঢাকার মানুষ হিসেবে ছিলেন ভোজনরসিক(তবে তার লেখায় বাকরখানির কথা থাকলেও বিন্দুমাত্র কাচ্চির কথা নেই!) এবং যে দেশে যেতেন সেখানকার অন্তত একটা রান্না শিখে আসতেন।

প্রফেসর রাজ্জাকের শিল্পকলা বোধও খুব তীক্ষ্ণ! তিনি বলেন শিল্পাচার্য জয়নুলের মত স্পেসের ব্যবহার আর কোন শিল্পী এত নিখুঁতভাবে করতে পারেনি; দুজন পালকি বাহকের মাঝে যে সুন্দর দূরত্ব থাকার কথা সেটাও তার ছবিতে আছে! ছবিতে খালি যায়গা রাখাও যে একটা মুন্সিয়ানা সেটা জয়নুল দেখিয়েছেন। এসব থেকেই বোঝা যায় প্রফসর সাহেবের বোধের জায়গাটা কত গভীর। পরে আহমদ ছফার চেষ্টায় এস এম সুলতান প্রফেসর রাজ্জাকের নজরে আসেন পক্ষান্তরে দেশবাসী এস এম সুলতানকে আবিষ্কার করে। যদিও এখানে লেখকের ভূমিকার কথা লেখক সন্তর্পনে এড়িয়ে গেলেও সচেতন পাঠকমাত্রই বুঝবেন এই গুণী শিল্পী হয়ত সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতেন লেখকের চেষ্টাটুকু না থাকলে। গানের বেলাতেও তার নজরুল প্রীতি লক্ষ্য করবার মত। শিল্পী আব্দুল করিমকে তিনি অনন্য সুরের আধিকারী বলেছেন। সামান্য মৃৎশিল্পীর মাঝে তিনি ভাষ্করকে আবিষ্কার করেছিলেন।

তার অবসর কাটত একমাত্র দাবা খেলায়। বাংলাদেশের প্রথম গ্রান্ড মাষ্টার দাবাড়ু নিয়াজ মোর্শেদকেও প্রশিক্ষণ ও পারিবারিক সাহায্য দিয়েছেন এই প্রফেসর।

তার পরিচয়ের বলয়টাও ঈর্ষা করবার মত। নিজে পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন প্রখ্যাত অর্থনিতিবিদ হ্যারল্ড লাস্কির তত্ত্বাবধানে! যার কাছে নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তাকে বিকোতে হবে বলে পিএইচডি শেষ না করেই থিসিস পেপার নিয়ে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। অবশ্য এই সূত্র ধরে কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জনের একটা "সহজ সূত্র" পাওয়া যায়ঃ "যা কিছু সামনে আসে গোগ্রাসে পড়তে হবে, কিছুদূর যাবার পর আপনাতেই বোঝা যাবে কোনদিকে এগুতে হবে"।

এছাড়া চমকিত হই যখন স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে খুব স্বল্প সময়ের সফরে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং বাংলাদেশ সরকার উদ্ভুত পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জারকে সাদরে অভ্যর্থনা জানানোর আয়োজন করে। সেখানে সুযোগ পান মলিন পোষাকের প্রফেসর রাজ্জাক যাকে কিসিঞ্জার নিজের স্ত্রীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন "সহকর্মী" হিসেবে! যদিও মাত্র দু-ঘন্টার সফরের আধ ঘন্টাই যখন রাজ্জাক সাহেব নিয়ে নেন তখন সরকারের একটু নড়ে চড়ে বসতে হয় বৈকি! এমনকি ডিক উইলসনের লেখা বই "এশিয়া আ্যওয়েকস" (যেটাকে গুনার মিরডালের নোবেল পাওয়া বই এশিয়ান ড্রামার সমকক্ষ ধরা হয়) বইয়ের উৎসর্গপত্রে লেখা "টু আব্দুর রাজ্জাক অব ঢাকা"!

ইতিহাস নিয়ে তার জ্ঞান কিছু কথাতেই স্পষ্ট হয়ঃ "আপনারা রামমোহনরে একেবারে আকাশে তুইলা ফেলাইছেন, রামমোহন বিলেতে যাবার সময় তাকে 'রাজা' টাইটেল দিলেন বাহাদুর শাহ যার নিজেরই কোন রাজত্ব আছিল না। কিন্তু রামমোহন সেইটা সারাজীবন আগলাইয়া রাখলেন!" যদিও বাংলা ভাষার গৌড়িয় ব্যকরণের কাজ করাকে রামমোহনের অনন্য কাজ হিসেবে বলেছেন তিনি। উর্দু, আরবি, ফারসি, সংস্কৃত অনেক ভাষাতেই কাজ করার সুযোগ থাকলেও বাংলাকে বেছে নেয়াই রামমোহন অনন্যতা। তবে তিনি নব্বইয়ের দশকের সত্যিকারের "বড় মানুষ" হিসেবে বলেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথা।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনি বলেছেন "ইতিহাস ওনাকে স্টেটসম্যান হইবার সুযোগ দিছিল"! এখানে অবশ্য গভীর ভাবনার অবকাশ আছে, কারণ নানা কথায় পরবর্তীকালে তাকে জিন্নাহর সমর্থনে দেখা যায়। তার "পাকিস্তান" সমর্থনের পেছনে যে কারণ লেখক দেখিয়েছেন তা লেখকের নিজেরই মনঃপুত না হলেও সেখানে চিন্তার খোরাক মেলে, গভীর চিন্তার খোরাক!

এই জ্ঞানী মানুষটিকে নিয়ে খুশবন্ত সিংয়ের ইলাস্ট্রেটেড উইকলি অব ইন্ডিয়াতে প্রধান প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল। যিনি পরে দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডী-লিট পান।

ফজলুল হকের সাথে সাক্ষাতে একবার তিনি সরাসরিই বলেছিলেন "আপনি খুব সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য মিছা কথা কইবার পারেন"! ফজলুল হকের ওপর গবেষনার কাজেই রাজ্জাক সাহেবের কাছে এসেছিলেন মিসেস কামাল হোসেন; হামিদা। বস্তুত প্রফেসর রাজ্জাকের বাসাতেই তাদের পরিচয় ও পরবর্তিতে বিবাহ, কারণ তিনি দুজনকেই বিশেষ স্নেহ করতেন।

এভাবেই নানা মানুষ তার সহচার্যে এসেছেন, নিজেদের স্বার্থে বা প্রয়োজনে। কাউকেই তিনি ফিরিয়ে দেননি। এমনকি তার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে লেখা বইয়ের লেখকও যখন তার কাছে বিদেশী স্কলারশীপ পাবার জন্য রিকমেন্ডেশন চায়, তিনি অবলীলায় তা করে দেন। বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় এভাবেই এক জ্ঞানী ও মহৎ চরিত্রের প্রফেসর রাজ্জাককে খুঁজে পাওয়া যায়। যদিও নোট রাখা বা টুকে রাখার অভ্যাস না থাকায় এই বইটি যে লেখকের নিজের মতামতের মিশ্রণ না- তা বলা যায়না তথাপি একজন অসম্ভব জ্ঞানী মানুষের দেখা মেলে। যিনি নিজে কিছু লিখে জাননি বলে হয়ত তার জ্ঞানটুকু বা পরিচয়টুকু আমরা খুব একটা পাই না। কিন্তু তিনি কেন তেমন কিছুই লেখেন নি তার একটা আহমদ ছফা ব্যাখ্যা বেশ আগ্রহউদ্দীপকঃ তিনি তার সমকালীন সকলের চাইতে এতটাই বেশী জ্ঞানী ছিলেন যে তার লেখা তখনকার লোকে ঠিক নিতেই পারত না, তার লেখার গভীরতা বুঝবার মত পাঠকশ্রেণীর অভাবেই মূলত তিনি লেখেন নি!!!

এই শেষ কথাটুকুই কিন্তু তাকে আরো রহস্যময় করে তোলে!

১৪/১০/২০১৮

Saturday, September 29, 2018

বুক রিভিউ - বৃষ্টির দিন - মইনুল আহসান সাবের

কে যেন বলেছিল 'বইটা কি আছে আপনার কাছে?" আমার কাছে ছিলনা, একটা যেনতেন পিডিএফ পাওয়া গেল, সেটাতেই নাকি চলবে।

ভাবলাম এত কষ্ট করে পিডিএফ পড়বে! কী এমন বই!? পড়েই দেখি।

পড়তে বসে প্রথমে একটু আগ্রহ হচ্ছিল; সত্যি কথা বলতে একটা বৃষ্টির দিনে বইটার বইয়ের নামের জন্যেই বইটা পড়তে শুরু করা। শুরুটা ভালো লেগেছে, আনুশকা, লোপামুদ্রা,সৌম্য এদের কথা ছিল, পরে অপি, লেখা, মিন্টু, মাফি, এদের কোথাও আসলো; ভাবছিলাম একটা প্রাণোচ্ছল তরুণ প্রজন্মের কথা পাওয়া যাবে এই ভেবে এগিয়ে গেলাম। বেশ বড়সড় বই! ছোট ছাপায় ১৮৮ পাতা।

তবে মাঝে গল্পটা বুঝে ফেলায় অত রোমাঞ্চ ছিলনা তবে শেষ করে খারাপ লাগেনি। যদিও এই বইটা ঠিক "এখনকার আমার" জন্য নয়, আরো একটু তরুণ সময়ে পড়লে হয়ত বড় হাহাকারের জন্য দায় পড়ত বইটায়!

সবকিছু ঠিকঠাক চলতে থাকা দুটি তরুণ তরুণীর মাঝে প্রেম আসা, তরুণটি হঠাৎ করে ঘটনাচক্রে রাজনীতির নোংরা খেলায় জড়িয়ে পড়ে। একদিকে যেমন সে সবকিছুর প্রতিবাদ করতে চায়, আবার পথটাও ঠিক মেনে নিতে পারেনা। চুড়ান্ত কোন এক পরিণতি মেনে নিতে হয়। মাঝে আসে ছোট ছোট অনেক চরিত্র।

পুরোটাকে শুধু প্রেমের উপন্যাস বললে ভুল হবে, প্রেমের উপাখ্যান ততটা নেই যতটা আছে তখনকার বা সমসময়কার এলাকা দখল, রাজনীতি ও মাস্তানির বাস্তবতার কথা। ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের কথা।

আমি জানিনা এখনকার প্রেমের উপন্যাসে কি ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার বা স্কাইপ আসে কিনা! কিন্তু এই লেখা সেই সময়ের যখন এগুলো ছিলোনা! তবুও এইখানে মইনুল আহসান সাবেরের আগের লেখাগুলোর মত লাগেনি আমার। তিনি আরও ভালো লেখেন, যদিও "যুক্তি" থাকে বেশী সেসবে কিন্তু পাঠক "আবেগ" চায় বেশি!

অপেক্ষা আর আকুতি ভরা উপন্যাসে তাই শেষে অপিদের জন্য, আনুশকাদের জন্য মন কেমন করে।

২৪/০৮/২০১৮

Friday, March 7, 2014

বইমেলা আর বই

দেখতে দেখতে আরো একটা বছর চলে গেল! এই ফেব্রুয়ারি মাসে বছর চলে গেল! না চোখ কপালে তুলবেন না। মানে এই বছরের মত বইমেলাটা শেষ হয়ে গেল, ২১ চলে গেল, ২১ থেকে ২৮ ও চলে যাচ্ছে! বইমেলা নিয়ে এই বোধ হয়ত আমার মত আরো অনেকেরই। মেলাপ্রিয় এই জাতি এই বইয়ের মেলাটাকেও বড় ভালোবাসে!

প্রতিবছর বইমেলা আসলেই নতুন বইয়ের জন্য মনটা কেমন আনন্দে ভরে ওঠে; কয়টা বইইবা কিনতে পারি (কত্ত চমৎকার বই); ভাবতে থাকি কে কে কি কি বই কিনলো আর ওদের কাছ থেকে বইগুলো কবে নিয়ে পড়ে ফেলা যায়! ছোটবেলা থেকেই বাসায় পড়ে পড়ে ধূলো পড়া আব্বার বইগুলো পড়ে ফেলেছিলাম! আমার নজরুল প্রীতি আর বয়সের চেয়ে বেশী গম্ভীর হয়ে থাকার কারণও মনেহয় অই! কিচ্ছু বুঝিনাই কড়ি দিয়ে কিনলাম; পথের দাবী;  পৃথিবীর পথে পড়ে ফেলেছিলাম!  কী মোটা মোটা বই! ছোটবেলার সেই ধীরগতিতে ওই বই পড়া সম্ভব হয়েছিলো কেবলমাত্র পড়ার একটা "ক্ষুধা" থাকার কারনে! এখনকার শিশু-কিশোর-তরুণ মনগুলো কি সেই ক্ষুধা সেইভাবে অনুভব করে?

অবশ্য এটা খুব খুশির কথা বইমেলায় আসা এত বইয়ের পাঠকের মত যেটা আমি এখনো অনুভব করি সেটা হলো বই পড়ার ইচ্ছা! এখনো আমার মনে হয় রাত দিন চোখমুখ গুজে একটা বই পড়ে ফেলার মত আনন্দের আর কিছু হয়না! যদিও সেই ফুরসত অনেকটাই কমে গেছে, “চলচিত্র” তার অনেকটা জায়গা নিয়ে নিয়েছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একটা “ভালো” বই একটা চলচিত্রের চাইতে শক্তিশালী।
কীভাবে?
এই যে যখন কেউ একটা উপন্যাস পড়ে, তখন সেই উপন্যাসের চলচিত্রায়ণ হতে থাকে পাঠকের মনের ভেতর সে চাক বা না চাক, লেখকের বর্ণানা আর পাঠকের কল্পনার মিশেলে তৈরি হতে থাকে এক একটা চেহারা, একটা বাড়ির উঠান-ঘাস বা একটা ধু ধু বালু-মাঠ বা একটা পাহাড়-বন-সমুদ্র এমনকি একটা মায়াবতী চেহারা, ক্লান্ত বাতাসে উড়ে যাওয়া চুল, ঠোটের কোনের হাসি অথবা ধরা যাক কোন সুদর্শন যুবা যার চাহনিতে তীব্র আত্নবিশ্বাস, চোয়ালে ফুটে ওঠা মনের ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা সব স...ব সবকিছু... যা কিছু মানুষকে কল্পনার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তার সব রঙ মিশিয়ে সে সেই বইয়ের লেখাগুলোকে দৃশ্যায়ন করে ফেলে। সেখানে সেইই তার সেই নিজের জন্য তৈরি করা সিনেমার সত্যজিৎ!

চাইলেই পাঠক তার মনের মত করে তৈরী করে নিতে পারে সমস্ত খুঁটিনাটি! এবং এই পুরো অসাধারন একটা ব্যাপারের জন্য কি পাঠককে খুব কষ্ট করতে হয়! মোটেই না। বরং যতক্ষণে লেখাগুলো কোন অর্থ বহন করে পাঠকের নিউরণে যায় সেই নিমিষ সময়েই অযুত কোটি শব্দ-রং মিলিয়ে একটা কল্পদৃশ্য মস্তিস্কে তৈরী হয়ে যায়, এবং এই ব্যাপারটাই পাঠককে তার আজান্তেই বইয়ের পরের পাতাতে নিয়ে যায়! এ এক অসাধারণ ব্যাপার! কখনো সে আনন্দে হেসে ওঠে, কখনো চোখের কোনে অশ্রু জমে, কখনো ক্রোধ, ঘৃণা, হাহাকার বা কোন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা! অনুভুতির জগত নিয়ে এত সুন্দর খেলা করার সুযোগ বই পড়া ছাড়া আর কোথায়! আর নিজের অনুভুতির জগতকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য হাজার হাজার বই তো পড়েই আছে!

আমি মনে করতে পারি প্রথম যখন ছোটদের “ডেভিড কপারফিল্ড” পড়ে এক বিকেল কেঁদেছিলাম। (হয়ত পৃথিবীর মানুষ দুঃখবিলাসী বা পৃথিবীর মধুরতম সংগীত, শ্রেষ্ট কবিতা-গান সব বিরহের – এই কারণে কাঁদার বইয়ের কথাই মাথায় আছে) কিন্তু সেই শেষ বিকেলের ছলছল-চোখজল’এর যে অনন্দ তা এখনো আমি অনুভব করতে পারি। শরতের (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) গ্রীষ্ম-বর্ণনা আর চরিত্রের খুঁটিনাটির যে নিখুঁত বিবরণ তা আজো পাঠককে ভাবায়, প্রেমে পড়ে দেবদস হওয়াও যে “একটা কিছু” “হওয়া” তা তো শরৎবাবুই বুঝিয়ে গেলেন। নজরুলের বিদ্রোহী থেকে সুকান্তের ছাড়পত্র- কত শত আবেগের দোলা। আর রবিবাবু একাই যা লিখে গেলেন – বাঙ্গালি তার নিত্যদিনকার সুখ-দুখ-সব অনুভুতিতে সেখানেই আশ্রয় খোঁজে। আর আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, অনুভব করি- প্রকৃতি দেখার চোখ বিভূতিভূষণের যেমন ছিল তেমনটা আর কারো নয়। কেউ যদি প্রকৃতি দেখার জন্য তার মনের হাজারটা চোখ মেলে চাইতে চায় তবে যেন সে বিভূতিভূষন-এর লেখা পড়ে! ছোট ছোট বিষয় নিয়ে যে কি মজা করে ভাবা যায় তা’র জন্য সুকুমার, রহস্যের হাতেখড়ি সত্যজিৎ, যৌবনে জীবনানন্দের “বনলতা” খোঁজা... এভাবে বলতে থাকলে মানিক, সঞ্জীব, সুনীল, শীর্ষেন্দু, শরদিন্দু্‌, সমরেশ থেকে আমাদের জাফর-হুমায়ূন (এদের নিয়ে বলা শুরু করা যাবেনা, শুরু করলে থামা মুশকিল হয়ে যাবে... বোধকরি আমাদের প্রজন্মটা বই পড়া নতুন করে শিখল এদের জন্য; এহ এ্যা তিন গোয়েন্দা-মাসুদ রানা চলে আসছে...) পর্যন্ত একটা বিরাট গদ্য রচনা হয়ে যাবে কোন উপযুক্ত বয়ান আমি না করতে পারলেও। (চট করে এই এত্তগুলো নাম চলে এসেছে ভাবলে আরো আজস্র মণি-মুক্তার দেখা মিলবে নিঃসন্দেহে)

আগের দিনে মানে এক দশক আগেও লোকে হয়ত তার বাসায় একটা ভালো পরিমাণ বই সাজিয়ে রাখাকে একটা রূচি বা আভিজাত্যের পরিচয় হিসেবে দেখত কিন্তু এখন মনে হয় সেই জায়গাটার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। লোকে তাদের দামি ফ্ল্যাটের দামি জায়গাটা আর কাগজ দিয়ে ভরতে রাজী নয়। দামি দামি শো-পিস বা দামি কোন অডিও ভিজ্যুয়াল ইন্সট্রুমেন্ট সেই জায়গাটা দখল করছে। মোটকথা বইয়ের দাম লোকের কাছে কমে গেছে। এত সহজেই যখন হাতেই তালুতে সব, চাইলেই একটা ধুন্ধুমার সিনেমা চালিয়ে দেয়া যায়, শুধু চালিয়েই না ফরমায়েশমত যখন তখন থামা-চালুও করা যায় তখন আর কষ্ট করে বই কে পড়ে! কিন্তু বই না পড়ে পড়ে যে আমাদের “বোধ”-এর জগতকে ভোতা করে দিচ্ছি তা কি কেউ ভেবে দেখছি?

তবে বই মানেই তো আর গল্প-উপন্যাস-কবিতা না, ছাত্রের নাহয় বাধ্য হয়ে বইকিছু কিনতে হয়-কাধে কাধে বইতে হয় কিন্তু “চেক-বই” টাইপের বইয়ের কদর তো কিছুমাত্র কমেনাই সেটা আর বলে দেয়া লাগেনা।

সে সব কথা থাক, কি বলতে কি বলে ফেলছি! তবে আমি আমাদের এই প্রজন্মকে শুধু একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, সেই ছোটবেলায় প্রমথ চৌধুরির “বই পড়া” থেকে কিছু যদি নাও শেখা যায়, “বই” পড়ে যা কিছু শেখা যায়, যা কিছু “অর্জিত হয়”(এর চাইতে ভালো বাংলা মাথায় আসছে না) তার কিন্তু কোন বিকল্প নাই। হাজার গান-সিনেমার মাঝে বইয়ের জায়গাটা কিন্তু সবার উপরে, বলতে গেলে শুরুর দিকের ব্যাপার। তাই এই বই ব্যাবসার, ব্যাবসায়ী লেখকের যুগে যদি আমরা আরো একটু বই পড়তে পারি তবে মন্দ হয়না, তাইনা! শত সহস্র সিনেমা গানের মত অক্ষরের বইগুলো কতশত অনুভূতির ঝড় তোলার জন্য বসে আছে, এখন শুধু নেবার অপেক্ষা অর্জনের অপেক্ষা!

আর সেই সাথে আমি আমার শৈশবের সেইসব বন্ধুদের কথা মনে করতে চাই যাদের বইগুলো আমার ছেলেবেলা’কে এত অনন্দময় করেছিল। সেইসাথে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবু সায়ীদ স্যারের কথা বলতে চাই যে সোনার হৃদয়ের মানুষটা হাজারো শিশু-কিশোরের মনকে “আলোকিত” করে তুলছেন! যার জন্য এখন সবাই মিলে একটা আলোকিত বাংলাদেশের অপেক্ষা করতেই পারি!