Showing posts with label আনন্দ. Show all posts
Showing posts with label আনন্দ. Show all posts

Thursday, May 21, 2015

লাল-বাগ, লাল কেল্লা

সেই কবে যেন একবার লালবাগ কেল্লা গিয়েছিলাম শেষবার, তাও ঠিকঠাক হিসেবে ৯ বছর আগে হবে। সেবার গিয়ে প্রায় পুরোটা আস্তে আস্তে ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম আর শুধু মনে হয়েছিলঃ “আহা! কী ঐশর্যই না ছিল আমাদের আর কী তীব্র আবহেলাই না করছি আমরা!”

আমার কেন যেন মনে হয় উপার্জনের চিন্তা না থাকলে আমি সত্যি যদি কিছু হতে চাইতাম সেটা হচ্ছে ‘আর্কিওলজিস্ট’! সেই একই জনপদ, একই আকাশ, একই চাঁদ-তারা-সূর্য, একটু অন্যভাবে বলতে গেলে জিপিএস হিসেব করলেও সেই একই জায়গা পাওয়া যাবে কিন্তু শুধু বদলে যাওয়া সময়ের সাথে বদলে যায় ‘নশ্বর’ মানুষগুলো আর চারপাশ। রেখে যায় কত আনন্দ-বেদনাকাব্য; যা কিছু বর্ত্মান একসময় সব ইতিহাস হয়ে যায়। নতুন সময় আসে, সভ্যতা আবার নতুন করে চলে, আবারো তৈরী হয় নতুন ইতিহাস!
সেই কবিতার মত “তারপর ইতিহাস হব” , আসলেই তারপর সব ইতিহাস হবার গল্পগুলো কী চমৎকার মোহময়ই না হয়! যাকগে সে কথা! আমি আসি এখনকার কথায়!

তো গতবারেই দেখেছিলাম কিছু সংস্কার কাজ শুরু হয়েছিল, হাতুড়ির ঠুকঠুক চলছিল আর একদিকের দেয়ালে তীব্র লাল রঙ দেয়া হচ্ছিল (যেটা তখন জেলখানার গায়ে দেখেছিলাম)। আমার ব্যাপারটা ভালো লাগেনাই তখনই, আমার মনে হত ‘এই তো সেই ইট যা সেই কবেকার কোন সময়ে গাঁথা, তখনকার ধূলোবালি-ঝড়-ঝঞ্ঝা বুকে নিয়েই সময়ের সাক্ষী হয়ে এতদিন টিকে আছে, বয়সের হিসেবে তো ওকে আমার দাদাও “আপনি” বলে ডাকবে! সেই ইটগুলো তো আর সামান্য ইট না, তার চাইতে বেশী কিছু! সেগুলোকে যখন সংস্কারের নামে কিছু রাজমিস্ত্রি ভেঙ্গে ফেলে, আমি মেনে নিতে পারিনা! আমার মনে হয় ওগুলোকে কেবল নরম ব্রাশ দিয়েই ছোঁয়া সম্ভব!

এবার গিয়ে দেখলাম বেশ পরিবর্তন বোঝা যায়, সেইসব বাতিল ইট ফেলে দিয়ে ওসব যায়গায় নতুন ইট বসেছে আর অনেক গাছপালা দিয়ে এর একটা নতুন আকর্ষণ নিয়ে আসা হয়েছে। “সাধারণ” দর্শকেরা এতে আকৃষ্ট হয়, ব্যাপারটা ভালো একটা চোখ “জুড়ানো ব্যপার” আছে। “সাধারণ দর্শক” বলছি এ কারণে যে আমি দেখেছি ঐসব জায়গাই বেশীরভাগ লোকেই যায় হাটার জন্য আর “দাঁতের কাজ” করার জন্য! (“মুখের কাজ” বললেও খারাপ বলা হয়না, তবে “হাতের কাজ” বললে লোকে ভুলে বুঝবে!) তারা চারপাশ দেখে আর বলেঃ “ধ্যূত! কই আসলাম দেখার কিছু নাই! খালি কয়টা হাড়ি-বাটি আর একটা কব্বর!” যেমনটা লোকে সমুদ্রের পাড়ে গিয়ে বলেঃ “ধুর কি দেখব! দেখার আছেটা কি! শুধু বালি আর পানি এইতো!?”

আগেরবারের হাম্মামখানা দেখে তো আমি থ! এত্তবড় জায়গায় নাকি একজন গোসল করতে আসত আর তার জন্য আবার গরম পানি আনা হত কি আয়োজন করেই! শুধু গরম পানিই না, এক চুল্লীর উপর দিয়ে বাতাস দিয়ে গরম বাতাসেরও ব্যাবস্থা ছিল। পোষাক পরিবর্তন কক্ষ আর চারপাশ তাকিয়ে স্নানপ্রক্রিয়ার প্রাইভেসি নিয়ে দোটানায় পড়ে গেছিলাম, পরেই মনে পড়ল এই চারপাশের বড় বড় দালানগুলো তো মরা হাতির পাশে চামচিকা’ই। তখন তো এর কোন অস্তিত্ব ছিলনা...

তখন ১৬৭৮ সাল। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এর তৃতীয় পুত্র মুহাম্মদ শাহ আজম ঢাকার সুবেদার হিসেবে এই দূর্গের নির্মানকাজ শুরু করেন। তখনকার দিনে এজকের এই নতুন ঢাকা ছিল শুধুমাত্র শ্বাপদের আস্তানা মাত্র, ঘন জঙ্গল আর বড় গভীর ডোবাপুর্ন, এদিকটায় বসতিও তেমনকিছু ছিলনা। সেদিক দিয়ে বুড়িগঙ্গা ছিল স্রোতস্বিনী, উদ্ভিন্নযৌবনা এক নদী যার প্রশ্রয়ে এর তীর ঘেষে ঢাকার পত্তন হয়। কেল্লার পায়ে তখন বুড়িগঙ্গার ঢেউ নূপুর হয়ে বাজে। মুঘল স্থাপত্যরীতির আদলেই গড়ে উঠতে থাকে “কেল্লা আওরঙ্গবাদ”; তখনকার সময়ে এই জায়গাটার নাম “আওরঙ্গবাদ” ছিল পরে ইসলাম খা’র শাসনামলে জায়গার নাম বলদে “ইসলামবাগ” হয়ে যায় (যা আজো “ইসলামবাগ” হয়েই আছে) আর কেল্লার নাম হয়...। ।  
দূর্গের কাজ শুরু হয়ে কেবল মসজিদ ও দরবার হল নির্মান শেষ হয়, (যে মসজিদে আজো মুসল্লিরা নিয়ম করে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন) আর এরই মধ্য মারাঠাদের যন্ত্রণায় আতিষ্ট মুঘল সম্রাট পুত্র শাহ আজমকে বিদ্রোহ দমনে দিল্লি ডেকে পাঠান। ঢাকার ঐশ্বর্যের মোহে পড়া শাহ আজম বুড়িগঙ্গায় জাহাজে ওঠেন আর পেছনে পড়ে থাকে আসমাপ্ত “কেল্লা আওরঙ্গবাদ”!

এরপর বাংলা শাসনে আসেন বিখ্যাত শায়েস্তা খাঁ, তার আমলে “টাকায় আট মন” চাল পাওয়া যেত। সেটা ১৬৮০ সালের কথা। তিনি নাকি কেল্লা’র কোন এক দরজায় এই বলে তালা মেরে যান যেঃ “কেউ যদি আমার পরে এর চেয়ে কম দামে বাঙ্গালিকে খাওয়াতে পারে সে যেন দরজাটি খোলে”। বলা বাহুল্য তেমন কেউ আর ইতিহাসে আসেনি আর আসবেওনা আর সেই না-জানা কক্ষের দরজাটিও চিরিদিনের জন্য বন্ধ থেকে হারিয়ে গেছে! শায়েস্তা খাঁ এরপর আবার দূর্গের নির্মাণকাজে হাত দিলেন। শায়েস্তা খা’এর প্রতি শাহজাদা আযমের আনুরোধও ছিল দূর্গের কাজ সমাপ্ত করার।

কিন্তু মানুষ চায় এক আর হয় আরেক! এ দূর্গের ভাগ্যে যেন শেষ লেখা নেই, প্রিয় কণ্যা “ইরান দুখত” বা “রহমত বানু”, পরিবিবি নামেই যিনি ইতিহাসে পরিচিত এবং যার বিবাহের কথা ছিল এই দূর্গের গোড়াপত্তনকারী শাহজাদা মুহম্মদ আযম শাহ’এর সাথে; সেই পরীর মত কন্যার মৃত্যুতে শোকে বিহ্বল পিতা দরবার হল বরাবর নির্মাণ করলেন কন্যার সমাধিক্ষেত্র। যেন দরবার হলের দরবারে বসে রাজকাজ পরিচালনার সবটুকু সময়ে কন্যাকে চোখের সামনে পাওয়া যায় আর মসজিদে যাবার পথেই পড়ত সমাধিটি। পরিবিবির সমাধিক্ষেত্রের জন্য দূর দুরান্ত থেকে মহামূল্যবান পাথর আনা হয়, সুদূর রাজমহল থেকে এনেছিলেন কালো ব্যাসল্ট পাথর। সাদা মার্বেল পাথরের বড় বড় ফলক এনেছিলেন জয়পুর থেকে। শ্বেত চন্দন কাঠ এনেছিলেন দরজা ও খিলান নির্মাণের জন্য। সমাধির ফলকগুলো রাখা হয় আস্ত। তার ওপর কাটা হয় নকশা। সমাধি সৌধের বিভিন্ন অংশ নির্মাণ করা হয় ফুলেল নকশাখচিত জালি ও ফলক দিয়ে। এটিই বাংলাদেশের মুঘল স্থাপত্যের একমাত্র নিদর্শন যেখানে পুরো সমাধিতেই মার্বেল পাথর ও ছাদে কষ্টি পাথর ব্যাবহার করা হয়েছে। আর এর ভেতরের নয়টি কক্ষ সাজানো চাকচিক্যময় বিভিন্ন রঙয়ের ফুল পাতার টালি দিয়ে যা দেশের অভ্যন্তরে অন্যান্য স্থাপতে বিরল। বলা হয়ে থাকে এর পুরো গম্বুজ এমনভাবেই সোনা দিয়ে ছাওয়া হয় যা রৌদ্রকরোজ্জল দিনে চারপাশে এক আশর্য দ্যুতি ছড়াত। তবে কালের যাত্রায় সেই সোনার পাতের বদলে যায় তামার পাতের আস্তরণে এখনও হয়ত তার কিছু অবশিষ্ট আছে তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে পরিবিবির মরদেহ আর এখন সমাধিক্ষেত্রে নেই বলেই ঐতিহাসিকদের ধারণা!

কন্যার মৃত্যুশোক আর কাটিয়ে উঠতে পারেননি শায়েস্তা খাঁ, কথিত আছে তিনি দূর্গকে ‘অপয়া’ ভাবতেন তবে এরপর তিনি আর দূর্গের কোন কাজে হাত দেননি। ১৬৮৮ সালে আগ্রা চলে যাবার পর নির্মাণকাজ শেষ হওয়া আবারও আনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

১৭০৪ সালে বাংলার শাসনকেন্দ্র মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত হলে দুর্গ হিসেবে লালবাগের রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায়। এটি ব্যাবহৃত হতে থাকে সৈনিকদের ব্যারাক হিসেবে। সিপাহী বিদ্রোহের সময়ও এখানকার সব বাঙ্গালী সৈনিকেরা গর্জে ওঠে কিন্তু সেনাপতি ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর “(নামটি মনে করতে পারছি না)” ও বৃটিষ বেনিয়ার সাথে সেদিন পেরে ওঠেনি বাংলার বিদ্রোহ। সৈনিকে রক্তে লাল হয় লালবাগ, লাল হয় বুড়িগঙ্গার পানি। এ যেন দূর্গের লালবাগ দূর্গের লাল’এর এর অনন্য মহিমা এনে দেয়।
এরপর বিভিন্ন সময়ে লালবাগ কেল্লা ব্যাবহৃত হয়েছে সেনানিবাস হিসেবে। ব্রিটিশরা একে প্রায় ১০০ বছর ব্যাবহার করেছে আর দিন দিন এর অবস্থা আরো করুণ থেকে করুণতর হয়েছে। আশেপাশে গড়ে উঠেছে সুউচ্চ অট্টালিকা যা কেল্লার সৌন্দর্য্যকে নষ্ট করে।
১৮৪৪ সালে ঢাকা কমিটি নামে একটি আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান দুর্গের উন্নয়ন কাজ শুরু করে। এ সময় দুর্গটি লালবাগ দুর্গ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে লালবাগ দুর্গের প্রাচীর সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে পত্নতত্ব বিভাগের অধীনে আনা হয়।

অবশেষে নির্মাণের প্রায় ৩০০ বছর পর গত শতকের আশির দশকে লালবাগ দুর্গের যথাসম্ভব সংষ্কার করে এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে এবং দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয়।
কালের বিবর্তনে সেই নূপুর হয়ে থাকা নদীপাড় দখল হয়ে চলে গেছে বহুদুর, কথিত যমুনাপাড়ে যাবার সুড়ংপথ বন্ধ হয়েছে চিরদিনের জন্য, কত না ঐতিহাসিক নিদর্শন “সামান্য ধূলোমাটি” হয়েছে অবহেলায়, কত আসল নিদর্শন ‘আনডিটেক্টেবল রেপ্লিকা’য় বদলে গেছে তার খবর রাখার মত বাঙ্গাল কই! সংস্কার করতে গিয়ে, দর্শনার্থী-বান্ধব করতে গিয়ে প্রধান মুঘলী ফটকের উচ্চতা কমে গেছে অনেকটা, সুন্দর খিলানের অর্ধেকটাই এখন কংক্রিটের নীচে, অপরুপ কারুকাজ সময় আর সংস্কার’এর সাথে পেরে না উঠে হারিয়ে গেছে চিরদিনের মত, সব ইতিহাস ঢাকা পড়েছে আজ লালবাগের ব্যাস্ততায়, সরু রাস্তার মতই সরু হয়ে এসেছে আমাদের পেছনে ফিরে তাকাবার চোখ।

এতকিছুর মাঝেও ২০০৩ এ বুয়েটের আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্ট আর উৎসাহী কিছু লোকের শুরুর জন্যই সরকারী ও বৈশ্বিক নজর বেড়েছে অনেক, নতুন “লাইট এন্ড সাউন্ড” শো’টা হয়েছে অসাধারণ এক আয়োজন। শব্দ আর আলোর বর্ণিল খেলার পাশাপাশি সৈয়দ শামসুল হকের স্ক্রীপ্ট, আসাদুজ্জামান নূর আর সুবর্ণা মোস্তাফার কন্ঠে ইতিহাস যেন উঠে আসে কালের সীমানা ছাপিয়ে চোখের সামনে। (এখানেও কিছু হতাশা আছে, লাইট শো’তে এতবেশী চারপাশের “লাইট” তাতে সত্যিকারের আমেজ নষ্ট হয়। বস্তুত এখন লালবাগকে বড়ই বেমানান লাগে ঐ আধুনিক প্রযুক্তির সুউচ্চ অট্টালিকার ব্যস্ত লালবাগে)!

পরিশেষে আমার শুধু মনে হয়ঃ
“৭ কোটি থেকে ১৭ হয়েছি হে বিমুগ্ধ জননী!
টিকে থাকাই সার্থকতা, পেছনে ফিরে তাকাতে পারিনি”!https://www.facebook.com/media/set/?set=a.10206782916081179.1073741850.1523718371&type=1&l=e9ff00afe8

Friday, March 7, 2014

বইমেলা আর বই

দেখতে দেখতে আরো একটা বছর চলে গেল! এই ফেব্রুয়ারি মাসে বছর চলে গেল! না চোখ কপালে তুলবেন না। মানে এই বছরের মত বইমেলাটা শেষ হয়ে গেল, ২১ চলে গেল, ২১ থেকে ২৮ ও চলে যাচ্ছে! বইমেলা নিয়ে এই বোধ হয়ত আমার মত আরো অনেকেরই। মেলাপ্রিয় এই জাতি এই বইয়ের মেলাটাকেও বড় ভালোবাসে!

প্রতিবছর বইমেলা আসলেই নতুন বইয়ের জন্য মনটা কেমন আনন্দে ভরে ওঠে; কয়টা বইইবা কিনতে পারি (কত্ত চমৎকার বই); ভাবতে থাকি কে কে কি কি বই কিনলো আর ওদের কাছ থেকে বইগুলো কবে নিয়ে পড়ে ফেলা যায়! ছোটবেলা থেকেই বাসায় পড়ে পড়ে ধূলো পড়া আব্বার বইগুলো পড়ে ফেলেছিলাম! আমার নজরুল প্রীতি আর বয়সের চেয়ে বেশী গম্ভীর হয়ে থাকার কারণও মনেহয় অই! কিচ্ছু বুঝিনাই কড়ি দিয়ে কিনলাম; পথের দাবী;  পৃথিবীর পথে পড়ে ফেলেছিলাম!  কী মোটা মোটা বই! ছোটবেলার সেই ধীরগতিতে ওই বই পড়া সম্ভব হয়েছিলো কেবলমাত্র পড়ার একটা "ক্ষুধা" থাকার কারনে! এখনকার শিশু-কিশোর-তরুণ মনগুলো কি সেই ক্ষুধা সেইভাবে অনুভব করে?

অবশ্য এটা খুব খুশির কথা বইমেলায় আসা এত বইয়ের পাঠকের মত যেটা আমি এখনো অনুভব করি সেটা হলো বই পড়ার ইচ্ছা! এখনো আমার মনে হয় রাত দিন চোখমুখ গুজে একটা বই পড়ে ফেলার মত আনন্দের আর কিছু হয়না! যদিও সেই ফুরসত অনেকটাই কমে গেছে, “চলচিত্র” তার অনেকটা জায়গা নিয়ে নিয়েছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একটা “ভালো” বই একটা চলচিত্রের চাইতে শক্তিশালী।
কীভাবে?
এই যে যখন কেউ একটা উপন্যাস পড়ে, তখন সেই উপন্যাসের চলচিত্রায়ণ হতে থাকে পাঠকের মনের ভেতর সে চাক বা না চাক, লেখকের বর্ণানা আর পাঠকের কল্পনার মিশেলে তৈরি হতে থাকে এক একটা চেহারা, একটা বাড়ির উঠান-ঘাস বা একটা ধু ধু বালু-মাঠ বা একটা পাহাড়-বন-সমুদ্র এমনকি একটা মায়াবতী চেহারা, ক্লান্ত বাতাসে উড়ে যাওয়া চুল, ঠোটের কোনের হাসি অথবা ধরা যাক কোন সুদর্শন যুবা যার চাহনিতে তীব্র আত্নবিশ্বাস, চোয়ালে ফুটে ওঠা মনের ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা সব স...ব সবকিছু... যা কিছু মানুষকে কল্পনার করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তার সব রঙ মিশিয়ে সে সেই বইয়ের লেখাগুলোকে দৃশ্যায়ন করে ফেলে। সেখানে সেইই তার সেই নিজের জন্য তৈরি করা সিনেমার সত্যজিৎ!

চাইলেই পাঠক তার মনের মত করে তৈরী করে নিতে পারে সমস্ত খুঁটিনাটি! এবং এই পুরো অসাধারন একটা ব্যাপারের জন্য কি পাঠককে খুব কষ্ট করতে হয়! মোটেই না। বরং যতক্ষণে লেখাগুলো কোন অর্থ বহন করে পাঠকের নিউরণে যায় সেই নিমিষ সময়েই অযুত কোটি শব্দ-রং মিলিয়ে একটা কল্পদৃশ্য মস্তিস্কে তৈরী হয়ে যায়, এবং এই ব্যাপারটাই পাঠককে তার আজান্তেই বইয়ের পরের পাতাতে নিয়ে যায়! এ এক অসাধারণ ব্যাপার! কখনো সে আনন্দে হেসে ওঠে, কখনো চোখের কোনে অশ্রু জমে, কখনো ক্রোধ, ঘৃণা, হাহাকার বা কোন দৃঢ় প্রতিজ্ঞা! অনুভুতির জগত নিয়ে এত সুন্দর খেলা করার সুযোগ বই পড়া ছাড়া আর কোথায়! আর নিজের অনুভুতির জগতকে আরো সমৃদ্ধ করার জন্য হাজার হাজার বই তো পড়েই আছে!

আমি মনে করতে পারি প্রথম যখন ছোটদের “ডেভিড কপারফিল্ড” পড়ে এক বিকেল কেঁদেছিলাম। (হয়ত পৃথিবীর মানুষ দুঃখবিলাসী বা পৃথিবীর মধুরতম সংগীত, শ্রেষ্ট কবিতা-গান সব বিরহের – এই কারণে কাঁদার বইয়ের কথাই মাথায় আছে) কিন্তু সেই শেষ বিকেলের ছলছল-চোখজল’এর যে অনন্দ তা এখনো আমি অনুভব করতে পারি। শরতের (শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) গ্রীষ্ম-বর্ণনা আর চরিত্রের খুঁটিনাটির যে নিখুঁত বিবরণ তা আজো পাঠককে ভাবায়, প্রেমে পড়ে দেবদস হওয়াও যে “একটা কিছু” “হওয়া” তা তো শরৎবাবুই বুঝিয়ে গেলেন। নজরুলের বিদ্রোহী থেকে সুকান্তের ছাড়পত্র- কত শত আবেগের দোলা। আর রবিবাবু একাই যা লিখে গেলেন – বাঙ্গালি তার নিত্যদিনকার সুখ-দুখ-সব অনুভুতিতে সেখানেই আশ্রয় খোঁজে। আর আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, অনুভব করি- প্রকৃতি দেখার চোখ বিভূতিভূষণের যেমন ছিল তেমনটা আর কারো নয়। কেউ যদি প্রকৃতি দেখার জন্য তার মনের হাজারটা চোখ মেলে চাইতে চায় তবে যেন সে বিভূতিভূষন-এর লেখা পড়ে! ছোট ছোট বিষয় নিয়ে যে কি মজা করে ভাবা যায় তা’র জন্য সুকুমার, রহস্যের হাতেখড়ি সত্যজিৎ, যৌবনে জীবনানন্দের “বনলতা” খোঁজা... এভাবে বলতে থাকলে মানিক, সঞ্জীব, সুনীল, শীর্ষেন্দু, শরদিন্দু্‌, সমরেশ থেকে আমাদের জাফর-হুমায়ূন (এদের নিয়ে বলা শুরু করা যাবেনা, শুরু করলে থামা মুশকিল হয়ে যাবে... বোধকরি আমাদের প্রজন্মটা বই পড়া নতুন করে শিখল এদের জন্য; এহ এ্যা তিন গোয়েন্দা-মাসুদ রানা চলে আসছে...) পর্যন্ত একটা বিরাট গদ্য রচনা হয়ে যাবে কোন উপযুক্ত বয়ান আমি না করতে পারলেও। (চট করে এই এত্তগুলো নাম চলে এসেছে ভাবলে আরো আজস্র মণি-মুক্তার দেখা মিলবে নিঃসন্দেহে)

আগের দিনে মানে এক দশক আগেও লোকে হয়ত তার বাসায় একটা ভালো পরিমাণ বই সাজিয়ে রাখাকে একটা রূচি বা আভিজাত্যের পরিচয় হিসেবে দেখত কিন্তু এখন মনে হয় সেই জায়গাটার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। লোকে তাদের দামি ফ্ল্যাটের দামি জায়গাটা আর কাগজ দিয়ে ভরতে রাজী নয়। দামি দামি শো-পিস বা দামি কোন অডিও ভিজ্যুয়াল ইন্সট্রুমেন্ট সেই জায়গাটা দখল করছে। মোটকথা বইয়ের দাম লোকের কাছে কমে গেছে। এত সহজেই যখন হাতেই তালুতে সব, চাইলেই একটা ধুন্ধুমার সিনেমা চালিয়ে দেয়া যায়, শুধু চালিয়েই না ফরমায়েশমত যখন তখন থামা-চালুও করা যায় তখন আর কষ্ট করে বই কে পড়ে! কিন্তু বই না পড়ে পড়ে যে আমাদের “বোধ”-এর জগতকে ভোতা করে দিচ্ছি তা কি কেউ ভেবে দেখছি?

তবে বই মানেই তো আর গল্প-উপন্যাস-কবিতা না, ছাত্রের নাহয় বাধ্য হয়ে বইকিছু কিনতে হয়-কাধে কাধে বইতে হয় কিন্তু “চেক-বই” টাইপের বইয়ের কদর তো কিছুমাত্র কমেনাই সেটা আর বলে দেয়া লাগেনা।

সে সব কথা থাক, কি বলতে কি বলে ফেলছি! তবে আমি আমাদের এই প্রজন্মকে শুধু একটু মনে করিয়ে দিতে চাই, সেই ছোটবেলায় প্রমথ চৌধুরির “বই পড়া” থেকে কিছু যদি নাও শেখা যায়, “বই” পড়ে যা কিছু শেখা যায়, যা কিছু “অর্জিত হয়”(এর চাইতে ভালো বাংলা মাথায় আসছে না) তার কিন্তু কোন বিকল্প নাই। হাজার গান-সিনেমার মাঝে বইয়ের জায়গাটা কিন্তু সবার উপরে, বলতে গেলে শুরুর দিকের ব্যাপার। তাই এই বই ব্যাবসার, ব্যাবসায়ী লেখকের যুগে যদি আমরা আরো একটু বই পড়তে পারি তবে মন্দ হয়না, তাইনা! শত সহস্র সিনেমা গানের মত অক্ষরের বইগুলো কতশত অনুভূতির ঝড় তোলার জন্য বসে আছে, এখন শুধু নেবার অপেক্ষা অর্জনের অপেক্ষা!

আর সেই সাথে আমি আমার শৈশবের সেইসব বন্ধুদের কথা মনে করতে চাই যাদের বইগুলো আমার ছেলেবেলা’কে এত অনন্দময় করেছিল। সেইসাথে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আবু সায়ীদ স্যারের কথা বলতে চাই যে সোনার হৃদয়ের মানুষটা হাজারো শিশু-কিশোরের মনকে “আলোকিত” করে তুলছেন! যার জন্য এখন সবাই মিলে একটা আলোকিত বাংলাদেশের অপেক্ষা করতেই পারি!