Showing posts with label হিমু. Show all posts
Showing posts with label হিমু. Show all posts

Friday, October 11, 2019

বুক রিভিউ - হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য: হুমায়ুন আহমেদ

এটি হিমু বিষয়ক কোন বই না। পড়তে গিয়ে পাঠক প্রথমেই প্রতারিত হবার সম্ভবনা আছে। মূলত "হিমু" ইমেজকে আশ্রয় করে সংকলিত ও নামাঙ্কিত একটি বই। বইটি এমনভাবে প্রকাশিত যেন মেলায় বিক্রি বেশি হয়। মূলত তখন হিমু বিষয়ক একটি বই সব প্রকাশকই চাইতেন, তাদের আবদার মানতে গিয়েই এমন বইয়ের প্রকাশ। হিমু সম্পর্কে লেখকের যে বাড়াবাড়ি প্রশ্রয় ছিল এটি তার একটি উদাহরণ মাত্র, লেখক সেটি কখনো অস্বীকারও করেননি।

এই বইয়ের বাড়তি পাওনা বলতে প্রতিটি গল্পের বা লেখার আগে লেখকের কিছু কথা; কিভাবে লেখাটি লেখা হল, লেখা সম্পর্কে লেখকের ব্যক্তিগত পছন্দ - অপছন্দ বা মতামত। এটুকু বিশ্বাস করে নিলে লেখকের ও তার লেখা সম্পর্কে একটা ধারণা করা যায়।

মোট দশটি গল্প আছে বইটাতে। এর মাঝে "পাপ" বিষয়ক গল্প তিনটি বেশ ভালো। এছাড়া "গন্ধ" গল্পটি ভালো। "জনৈক আব্দুল মাজেদ" এবং শিরোনামের "হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার" এই বইয়ের সবচে দুর্বল অংশ ("গল্প" বলা যাচ্ছেনা এগুলোকে যদিও এগুলো বিভিন্ন পত্রিকা ও প্রকাশনায় গল্প হিসেবে ছাপা হয়েছিল)

গল্পগুলোকে যদি আলাদা করে ব্যবচ্ছেদ করি তবে:

নসিমন বিবি -
ফরিদপুরের নসিপুর বিবির স্বপ্নে পাওয়া "উপহার" বিষয়ক একটি "আধোভৌক্তিক" লেখা। এটাকে হুমায়ূন আহমেদের সাইন্স ফিকশন বললেও ভুল হয়না। সুখপাঠ্য লেখা।

পাপ -
এই গল্পটি হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ১৯৭১ এর অংশবিশেষ। এইও "চিন্তা উদ্রেককারী" লেখা!

পাপ-২
হাজি মান্না মিয়া -
ভালো। ছোট গল্প হিসেবে চমৎকার।

পাপ-৩
সালাম সাহেবের পাপ -
মিসির আলীর একটি গল্প পুরো গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং। বিশেষ করে শেষটা।

দৌলত শাহ'র অদ্ভুত কাহিনী -
এটিকে হুমায়ূন আহমেদের সাইন্স ফিকশন গল্পের মাঝে ফেলা যায়। গাঁথুনিতে চমৎকার একটি গল্প।

শাহ্ মকবুল -
পাগল বিষয়ক গল্প। হুমায়ূন আহমেদের ফেলে যেসব লেখা শাওন থেকে কেনা ট্রাংকের মধ্যে জামাত সেই লেখার একটি পূর্ণাঙ্গরূপ এটি। ভালো তবে কোথায় যেন একটু আটকে যায়, খটকা লাগে পড়তে গিয়ে। একবার পড়ে ধরতে পারিনাই।

পিশাচ -
এটিকে চমৎকার গল্প বলা যায়। একজন মানুষ পিশাচ সাধনা করে যায় অন্তরে ধারণ করে এক সমুদ্র প্রেম আর মায়া।

গন্ধ -
চমৎকার একটি গল্প। গল্পের মাঝে একটা চমৎকার মোড় আছে যেটি দারুণ।

জনৈক আব্দুল মজিদ -
এটাও একটি ফরমায়েশি লেখা। বিশ্ব এইডস দিবস উপলক্ষে একটি ডকুমেন্টারি কাজ করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটা নিয়ে লেখা। এইডস সম্পর্কে সামাজিক বিজ্ঞান বইতে যদি একটা লেখা থাকত সেখানে যেরকম লেখা থাকবে এটি ঠিক সেরকম একটি লেখা। এই লেখা নাকি পাঠ্য বইতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল! সম্ভবত সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যবই- এ; বাংলা পাঠ্য বই- এ সাহিত্য হিসেবে না।

হিমুর একান্ত সাক্ষাৎকার -
একেবারেই ফরমায়েশি লেখা। লেখা নেবার জন্যে কেউ অপেক্ষা করছে। তাকে বসিয়ে রেখে একটা লেখা উৎপাদন করে দেবার প্রয়াসেই এই লেখা। যদিও এমন অবস্থাতেও হুমায়ূন আহমেদ অনেক ভালো লেখা লিখেছেন কিন্তু এ ক্ষেত্রে সেটি হয়নি। হিমুর সাথে জড়িত সব চরিত্রের সাথে একটি কাল্পনিক কথোপকথন।

১১/১০/২০১৯

Friday, August 9, 2019

বই পর্যালোচনা: মাতাল হওয়া - হুমায়ূন আহমেদ

মাতাল হওয়া বইটা আগে পড়া হয়নাই। এতদিন পর পড়লাম এমন একটা সুন্দর বই! মন খারাপ লাগছে!

বইটাতে হুমায়ূন আহমেদ তার নিজের ছাত্রজীবনের গল্প বলার পাশাপাশি মিলিয়ে আরো একটি গল্প বলার চেষ্টা করেছেন। সেই গল্পের নায়িকা নাদিয়া, দিয়া বা তোজল্লি!
এই নাদিয়া তার কাছে চিঠি লেখা সত্যিকারের শ্যামলা, ছিপছিপে, ঢাকা ভার্সিটি পড়ুয়া নাদিয়া হতে পারে আবার নাও হতে পারে! গল্পকার মাত্রই গল্প লেখেন, সত্য বয়ান  পাঠক পড়ে না!

এই বইতে হুমায়ূন আহমেদের অন্যান্য বইয়ের মত নায়িকাকে একবারও "অপূর্ব রূপবতী" বলা হয়নি বরং নায়ককে "গ্রীক দেবতাদের মত", "এমন সুন্দর পুরুষ দেখিনাই", "অপূর্ব রূপবান" ইত্যাদি বিশেষণ দেয়া হয়েছে একাধিকবার। গল্প যার নাম "রাজা চৌধুরী"।

গল্পের প্রধান চরিত্র হিসেবে বলা যায় দুদে উকিল, মোনায়েম খাঁর ছোট ভাই ময়মনসিংহবাসী হাবিব সাহেব, যার ডাক নাম "হাবু"। তবে এই ডাকনাম পড়ে তাকে মোটেই জেনতেন ভাববার কোন কারণ নাই। যেকোন কেইসকে নিজের পক্ষে নেবার ক্ষমতা তার আছে, তিনি চাইলে খুনের আসামীকেও ছাড়িয়ে আনতে পারেন, একজনের খুনের দায়ে অন্যকে সাজার ব্যাবস্থা করতে পারেন, পুলিশ আদালত তার হাতের তালুতে। শুধু তার মায়ের কাছে তিনি হাবু!

হাবিব সাহেবের মা, হাজেরা। যিনি সারাক্ষনই তার ঘরে থাকেন এবং সবাইকে তার ইচ্ছামত হুকুম করেন। তার নিজের একটা আলাদা জগৎ আছে, নিজের চিন্তার জগতে তিনি স্বতন্ত্র। অসম্ভব বুদ্ধিমান একজন নারী। তবে তার ছেলে হাবিবের সাথে তার একটা চারত্রিক দ্বিমুখীতা আছে যদিও হাবিব নিজে যতই ধূর্ত হোক, যতই নিয়মের বাইরে যাক মায়ের প্রতি তার আচরণ কখনোও বিরূপ নয়। যদিও হাজেরা বিবি তার এই আচরণের একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন গল্পের এক পর্যায়ে।

গল্পের নায়ক বিশাল জলমহালের অধিকর্তা পুত্র রাজা চৌধুরি, হাসান রাজা চৌধুরি। যে এখানে খুনের দায়ে পালিয়ে বেড়ানো আসামী আর হাবিবের সাহেবের মক্কেল! যদিও খুব বিকশিত নয় কিন্তু হাসান রাজা চৌধুরি এখানে চরিত্রবান পুরুষের ছবি।

গল্পের শুরুতে ফারুক চরিত্রের একটি সম্ভবনা দেখা দিচ্ছিল। যথেষ্ট সম্ভাবনাময় চরিত্র হলেও সে মূলধারায় আসেনি।

আরো কিছু চরিত্র আছে হাবিবের সহযোগী প্রণব বাবু, পাংখাপুলার রশিদ, নাদিয়ার শিক্ষক বিদ্যুৎ কান্তি দে (যদিও এই চরিত্রের একটি পরিণতি আছে কিন্তু বিকশিত হবার আরো সুযোগ ছিল! মানে, মনে মনে খুব চাইছিলাম)

গল্পের সাথে সাথে হুমায়ুন তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবনকে নিয়ে বলেছেন, সে সময়ের রাজনৈতিক পট নিয়ে কিছু কথা বলেছেন, মওলানা ভাষাণী আর শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থানের কথা আছে। যদিও এগুলোর চাইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাটাই বেশী আলোকিত হয়েছে। খোকা, পাচপাত্তুর এর সাথে তার হাত দেখা, ম্যাজিক দেখানো, প্লানচেট, সম্মোহনবিদ্যা, আনিস সাবেতের সাথে প্রথম মিছিলে যাওয়া এগুলোই বেশী উঠে এসেছে।

আরো গুরুত্বপূর্ণ  হচ্ছে হিমুর "রুপা" চরিত্র সৃষ্টির কথা। বন্ধুর হয়ে তার প্রেয়সীর জন্য প্রেমপত্র লিখে দেয়া, যেগুলোকে নিজে নিজেই তার প্রথম সাহিত্যকর্ম বলে স্বীকার করেছেন। লিখতে লিখতে রুপার ছবিও দেখা হয়ে যায়। হয়ত রুপার জন্য লিখতে লিখতে মিষ্টি রুপার জন্য হুমায়ুনের মনে একটা জায়গা তৈরী হয়েছিল। তাই রুপাকে হারিয়ে দিতে যেতে চাননি, অমর করে রেখেছেন তার গল্পের হিমুর সাথে।

গল্পের শেষের দিকে হাসান রাজা চৌধুরির মত একজন আদর্শ চরিত্রের যুবক কেন খুন করতে গেল তার রহস্য যেমন উন্মোচিত হয়েছে তেমনি একেবারে শেষে চূড়ান্ত বিয়োগান্তক সমাপ্তির মাধ্যমে নাদিয়া ও রাজা চৌধুরি চরিত্রদুটিও পরিণত হয়েছে।

পাঠককে ভাবাবার মত একটা সমাপ্তি আছে। একটা হাহাকার আছে, আবার অনেক উত্তর না জানা প্রশ্নও আছে।

সবমিলে চমৎকার একটা বই।

২৭/০৭/২০১৯